নিদাঘে নিদান

মালঞ্চে পুষ্পিতা লতা অবনতমুখী,
নিদাঘের রৌদ্রতাপে একা সে ডাহুকী 
বিজন-তরুর শাখে ডাকে ধীরে ধীরে
বনচ্ছায়া-অন্ত্মরালে তরল তিমিরে। 
নিদাঘ শব্দটার সাথে পরিচয় জীবনানন্দ দাশের ডাহুকী কবিতাটার মাধ্যমে। কিন্তু আসলে নিদাঘ মানে কী তা জানতে পারলাম ১৪২৪ বঙ্গাব্দের জৈষ্ঠ্য মাসে এসে।
গিয়েছিলাম নেত্রকোনার হাওড় এলাকাতে। সেখানকার মানুষদের ভাষায় ভাটি অঞ্চল। আল্লাহর হুকুমে এবার একটা বড় বিপদে পড়ে গেছেন তারা।
সরোবর একটা সামাজিক ব্যবসা। সমাজের মানুষদের ওপর যখন বিপদ নেমে আসে আমাদের একটা দায়বদ্ধতা থাকে তাদের জন্য কিছু করার। সামাজিক দায়বদ্ধতা। সে তাগিদেই যাওয়া।
হাওড় এলাকার বাস্তুতন্ত্রর সাথে এবারই প্রথম পরিচয়। এখানে ছয় মাসের চক্র চলে। ছ’মাস পানিতে সব তলিয়ে যায়। ছ’মাস ডাঙার দেখা মেলে। কার্তিক মাসের শেষ দিক থেকে পানি নামা শুরু করে। কৃষকেরা ধান বোনে পৌষ মাসে। তিন মাস পর, চৈত্রর শেষে, বোশেখের শুরুতে ফসল তোলার পালা চলে।
এবার চৈত্র মাসে অস্বাভাবিক বর্ষণ হয়। সাথে যুক্ত হয় ভারতের ছেড়ে দেওয়া পাহাড়ী ঢলের জল। ধান যখন পাকি পাকি, তখন মাত্র দুদিনের মধ্যেই পুরো হাওড় পানির নীচে। মানুষ কম চেষ্টা করেনি। একদিকে পাল্লা দিয়ে বাধ বানানোর কাজ চলেছে দুই ফুট অন্য দিকে পানি বেড়েছে চার ফুট।
ফসলের শেষ রক্ষা হয়নি। ডুব দিয়েও কাটা যায়নি আধ-পাকা ধান।
ব্যাপারটা ভয়াবহতা আসলে সেখানে না গেলে বোঝা যায় না। আমাদের মতো মাসিক চাকুরেজীবিদের জন্য বোঝা আরো কঠিন।
হাওড়ে ফসল একটাই। এটা দিয়েই তাদের সারাবছরের খোরাকি চলে। একবারে উৎপন্ন ধান বিক্রি করেই তারা সারাবছরের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনে। কিন্তু এই ফসলটা যখন মার যায় তখন ঘরে খাবার চাল মজুদ থাকে না। আবার চালটা যে কিনে খাবে সেই টাকাটাও থাকল না। বড় বিপদ। এই বিপদকে তারা বলেন নিদান।
আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার বাজার থেকে। প্রায় ৭৫০ কেজি ডাল, ১৫০ কেজি লবন আর ১৫০ কেজি সয়াবিন তেল নৌকাতে নেওয়া হলো।
নদী ধরে চলতে থাকলাম। দীর্ঘ পথ। রোদ। তবে নদীর বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে যায়।
নদীর দুতীর ধরে লাগানো হয়েছে নাইলা গাছ। পানির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে এরা। কোনো ফল দেয় না, তবে শীতকালে শুকিয়ে খড়ি-জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পথে চোখে পড়ল বড় বড় ব্যাপারী নৌকা। আর বছর ধান কিনে ভাসমান গুদাম ভর্তি করে নিয়ে যায় ধানের ব্যাপারীরা। এ বছর খালি।
হঠাৎ চোখ কপালে ওঠে। অকূল দরিয়ার মাঝে গাছ এল কীভাবে? ছয়মাস পানির নীচে শেকড় থাকার পরেও বেঁচে থাকবে এমন গাছের সংখ্যা খুব কম। তবুও ডুবে যাওয়া পথের ধারে দু-একটা গাছ বেচে থাকে আল্লাহর রহমতে।
হাওড় এলাকার গ্রামগুলোও অদ্ভুত। একচিলতে জায়গা মাটি ফেলে উঁচু করে সেখানেই বসতি। অল্প জায়গায় অনেক মানুষ ঠাসাঠাসি করে থাকে। ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপগুলোর চারপাশে বালির বস্তা ফেলে সেগুলোকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা চলে বর্ষাকাল জুড়ে। সবসময় শেষ রক্ষা হয় না।
একপাশে হাওড়, অন্যপাশে নদী। চিকন একফালি জমিন। গ্রামটির নাম পদেরকোনা।
মেঘের পরে মেঘ। সাদা, ধূসর, কালো। ঝড় আসবে নাকিরে বাবা?
মাটি যখন পানির নীচে তখন কিছু মানুষের জীবিকা পানি থেকেই দেন আল্লাহ। রাতে জাল পেতে রাখা, বিয়ানে ছোট মাছ ধরা।
ছোট্ট গ্রাম। সবজি চাষের জমি নেই এক রত্তি। মন কী তাতে মানে? ঘরের কোণে ঢেড়শ লাগানো হয়েছে। যে কটাই ধরে, ধরুক – আলহামদুলিল্লাহ।
গ্রামের প্রায় সবার নাম তালিকাতে ছিল। তাদের আসতে বলা হলো। মাথাপিছু মেপে দেওয়া হলো এক লিটার তেল।
সাড়ে চার কেজি ডাল। এক কেজি নুন। আর চাল কেনার জন্য দুশ টাকা। এই এলাকাতে ত্রাণ তেমন আসেনি। তবে সরকার বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করছে।
ছেলেটার নাম মাহফুজ। ও পূর্ব পাড়া থেকে এসেছে। তিন বোন এক ভাই। ও ক্লাস টুতে পড়ে। বাবা চাষ করে আর বর্ষাকালে নৌকা চালায়। জানতে চাইলাম, ধান কতটুকু পেয়েছ? পাইনি, বলল বাচ্চাটা। সব পানির নিচে।
তেল-নুন-ডাল নেওয়া শেষ। এবার মানুষগুলো নৌকায় করে ঘরে ফিরছেন।
সরোবর একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি এই যুগেও আমাদের হালালভাবে ব্যবসা করার তাওফিক দিয়েছেন। আমরা আমাদের মুনাফার কিছু টাকার সাথে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু টাকা ম্যানেজ করে গিয়েছিলাম। আমরা খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম ১৫০ পরিবারের জন্য। সেখান থেকে ভাগাভাগি করে দেওয়া হলো ১৬০ পরিবারকে। খুব সামান্য খাবার। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সাধ্যে যা কুলায় তা করার চেষ্টা করেছি।
আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে। কাউকে পরীক্ষা করেন সে ধৈর্য ধরে আল্লাহর হুকুম মেনে নিয়ে কৃতজ্ঞ থাকতে পারে কিনা। আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতি ফিরে আসে কিনা। আর কাউকে পরীক্ষা করেন সে আল্লাহর নিয়ামত পেয়েছিল, দুনিয়াতে ভালো ছিল। যারা বিপদে পড়েছিল তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল কিনা।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যেন আমাদের সবাইকে, যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দেন।

2 thoughts on “নিদাঘে নিদান

  1. “ফসলের শেষ রক্ষা হয়নি। ডুব দিয়েও কাটা যায়নি আধ-পাকা ধান।” এই লাইনটি পড়ে খুবি কষ্ট পেলাম…।
    ওআল্লাহ্‌, তুমি আমাদেরকে এবং তাদেরকে রক্ষা কর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *