হ্রদে ও পাহাড়ে

হিসেব মতে রাত দেড়টার দিকে কুমিল্লা থাকার কথা। কিন্তু মেঘনা ব্রিজের এপার-ওপার প্রচন্ড জ্যাম। শেষমেশ ভোর পাঁচটায় কুমিল্লায়। রাঙামাটি থেকে লংগদুর উদ্দেশ্যে সারাদিনে মাত্র দুইটা লঞ্চ ছেড়ে যায় – একটা সকাল সাতটায়, পরেরটা দশটায়। আমরা রাঙামাটি রিসার্ভবাজার গিয়ে পৌঁছতে পারলাম  সাড়ে এগারটায় ।

লঞ্চ ছেড়ে গেছে। এখন উপায়?

জানা গেল, দুপুর দুটায় একটা স্পিডবোট ছেড়ে যাবে লংগদুর উদ্দেশ্যে।

লংগদু কেন?

সরোবর কম্বল বিক্রি করে। কেউ কেউ নিজে ব্যবহার করার জন্য নেন, কেউ নেন অন্যকে দেবেন বলে। কেউ আমাদের অর্ডার করেন নির্দিষ্ট একটা স্থানে পৌঁছে দেবার জন্য। আমাদের একজন ক্রেতার নির্দেশনা ছিল রাঙামাটির লংগদুতে পৌঁছে দিতে হবে কম্বল।

সে কারণেই কাপ্তাই হ্রদ পাড়ি দেওয়া।

কাপ্তাই দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় মিঠাপানির হ্রদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ দেওয়ার কারণে প্লাবিত এলাকার নামে এই সুবিশাল হ্রদের নাম হয়েছে কাপ্তাই।

IMG_20181215_134909

দুপাশে পাহাড় মাঝে স্বচ্ছ টলটলে পানি। হিমশীতল বাতাস। কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীর বরফ হয়ে আসলো। ব্যাগ থেকে শীতের জামাকাপড় যা ছিলো এক এক করে সবকটা বের করে পরে নিলাম।

বেশ কিছুক্ষণ চলার পরে কর্ণফুলী নদীতে এসে পড়লাম। শুভলঙের পরই দুপাশের পাথুরে পাহাড় সরে যেতে লাগল। কর্ণফুলীর বিস্তৃত ঘেষে ছোট ছোট ভাসমান টিলা দৃষ্টিগোচর হতে লাগলো।

IMG_20181215_140801

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রাঙামাটি থেকে ছেড়ে আসা সকাল দশটার লঞ্চটাকে পাশ কাটালাম। মিনিটের ব্যবধানে ওটা কয়েক কিলোমিটার পেছনে পরে গেলো, একটু পর হাওয়া!

দুপুর দুইটা চল্লিশ। আমরা লংগদু উপজেলার মাইনিমুখ বাজারে লঞ্চ থেকে নামলাম।

IMG_20181215_150634 (1)

বাজারের ঘাট থেকে একটু পর আবার নৌকা নিলাম – ইঞ্জিনচালিত নৌকা। মাইনি নদী ধরে এগুচ্ছি। দূরের পাহাড়গুলো আবার কাছে আসতে শুরু করেছে।

সবচেয়ে উচু চূড়াবিশিষ্ট পাহাড়কে লক্ষ্য করে আমাদের নৌকা চলছে। আনুমানিক চল্লিশ মিনিট পর আমরা একটি ভাসমান গ্রামে এসে পৌছলাম। চারপাশে গুচ্ছ গুচ্ছ টিলা। প্রতিটি টিলার ওপর একটা করে বাড়ি।

একটা টিলার পাড়ে দেখলাম অনেক উৎসুক মুখ, বুঝলাম এটাই আমাদের গন্তব্য। নৌকা ঘাটে ভিড়লো।

IMG_20181215_155943

গ্রামের নাম মাহিল্লা। এখানে আছে বিখ্যাত ‘মাহিল্লা খতমে নবুয়্যাত মাদ্রাসা’। মাদ্রাসাটি টিলার ওপরে অবস্থিত।

IMG_20181216_064614

মাহিল্লা, কবিরপুর পাশাপাশি দুটো গ্রাম। কাপ্তাই হ্রদের সৃষ্টিলগ্নে গ্রামগুলো প্লাবিত হয়ে ভিন্ন এক বাস্তুসংস্থান তৈরী হয়। একপাশে কাপ্তাই হ্রদ, ওপাশে ভারতের মিজোরাম অঙ্গরাজ্য। পুরোটা সীমান্ত জুড়ে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এদিকটার আবহাওয়া অনেক ঠান্ডা। ঢাকায় যখন মৃদু আরামের শীত এদিকে তখন হাড়কাঁপা কনকনে ঠান্ডা। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় প্রায়শই বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি হলে শীতের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়।

এখানে জীবন বেশ কঠিন। সবকিছুতে টিলা বেয়ে নামতে-উঠতে হয়।

IMG_20181216_093403

তবে জানালা দিয়ে একবার বাইরে তাকালে আল্লাহর সৃষ্টির অপার সৌন্দর্য চোখে পড়ে।

IMG_20181216_061459

প্রাকৃতিক নৈসর্গের ব্যস্তানুপাতে গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা। মাছ ধরা আর পাহাড় চষে এদের দিনাতিপাত হয়। মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে পাহাড়ে রয়েছে বিভিন্ন সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। এরা অতি গরীব মানুষদেরও চাঁদা দিতে বাধ্য করে।  

চাষ যোগ্য জমির অভাব, যাতায়াতের অসুবিধা, বরফশীতল ঠান্ডা সবকিছুকে উপেক্ষা করে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলো এই পাহাড়ে সংগ্রাম করে টিকে আছে। যেসব মুসলিম ভাই-বোনেরা সরোবরকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন দুর্গম এলাকার এইসব অসহায় মানুষদের কাছে পৌঁছানোর তাদের উদ্দেশ্য কী?  

IMG_20181215_185456

উদ্দেশ্য হচ্ছে এই ভরসা দেওয়া যে পাহাড়ের অসহায় মুসলিমরা একা নয়, এখনও এই পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা তাদের কষ্ট বোঝেন, তাদের পাশে দাঁড়াতে চান।
আমরা যখন মাদ্রাসায় পৌছাই, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আর বিকেল হতেই ওদিকে ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। মাগরিবের পর আস্তে ধীরে সবাই আসতে শুরু করলো। বেশিরভাগই বৃদ্ধ। সবাইকে উদ্দেশ্য করে কিছু নাসিহাতমূলক কথা বলা হলো।

IMG_20181215_182225

পরদিন সকালে নৌকা নিয়ে এলাকায় বের হলাম। ছোট্ট কোষা নৌকা। নৌকা বোঝাই কম্বল। আমরা টিলাগুলোতে গেলাম। 

IMG_20181216_081302

গাছগাছালিতে ভরা ছোট্ট টিলাগুলো। ঘাটে ঘাটে ভিড়ে তালিকাভুক্ত মানুষদের হাতে পৌছে দেওয়া হলো তাদের কম্বল।

IMG_20181216_092409

এক জায়গায় দেখলাম পিচ্চি এক মেয়ে তার চেয়েও পিচ্চি আরেকটাকে নিয়ে নৌকা বাইছে। নৌকার একপাশ ভাঙ্গা। মাঝি পিচ্চিটা কি সুন্দর হিজাব করা। দক্ষ হাতে আমাদের পাশ কাটিয়ে নৌকা নিয়ে চলে গেলো পাশের টিলাতে। ঘাটে নৌকা ভিড়িয়েই উধাও। ওদের স্বাভাবিক লজ্জাবোধ মাশাআল্লাহ। নৌকায় যত মহিলাদের দেখেছি সবাই মোটামুটি হিজাব করা ছিলেন।

IMG_20181216_085539

স্থানীয়দের কম্বল দেওয়া শেষে মাদ্রাসার ছাত্রদের মাঝে কম্বল দেওয়া হলো। পাশাপাশি ভালো করে পড়াশোনার উৎসাহ দেওয়া হলো।  আল্লাহ কুর’আনে জ্ঞানার্জনের কথা বলেছেন শুরুতেই। বাচ্চারা মন দিয়ে শুনল সব।

IMG_20181216_111242

এরপর ফেরার পালা। মাদ্রাসার নিজস্ব নৌকায় চড়ে  মাইনিতে ফেরত আসলাম। চালক মাদ্রাসার দুই ছাত্র। মাইনিমুখ বাজার নেমে বাইকে করে প্রথমে দীঘিনালা, তারপর খাগড়াছড়ি। এ এক বিভীষিকাময় যাত্রা। সারাক্ষণই চড়াই উৎরাই। সাথে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। কনকনে ঠান্ডায় বরফ হয়ে বসে ছিলাম বাইকের পেছন। কিন্তু যখনই মনে এল পিচ্চিটা হাসিমুখে কম্বল হাতে বাবার পাশে হেঁটে যাচ্ছে তখনই সব কষ্ট স্বার্থক মনে হচ্ছিল। 

IMG_20181216_084408

খাগড়াছড়িতে শুরু হলো আবার আরেক অভিযান। সে আরেক বিশাল গল্প। যারা সরোবর থেকে কম্বল কিনেছেন এবং সরোবরকেই বিতরণের দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের জন্য আমাদের অভিজ্ঞতা আর কিছু ছবি শেয়ার করার জন্য এ ফটোব্লগ।

আমাদের বিক্রি এখনও চলছে। একেকটা কম্বল আমরা বিক্রি করছি ৩৫০ টাকা দামে। কেনার জন্য ক্লিক করতে পারেন এই লিঙ্কে –  shorobor.org/blanket