সবুজ ছাদ

shorobor uddhan

মুহাম্মাদপুর বেড়ি বাঁধের ওপারে সরোবরে বেড়াতে এসেছিলেন চৌধুরি সাহেব। আসতে আসতে দেখলেন ছাদে বেশ সুন্দর একটা বাগান। কাছে এসে দেখা গেল চিচিংগা ঝুলছে গাছ থেকে। একটা অ্যাকুরিয়ামে মাছেরা খেলাও করছে।

কিছু কেনাকাটার পরে চৌধুরি সাহেব বললেন, আপনাদের ছাদের বাগানটা দেখা যাবে?

সরোবরের কর্মী মিষ্টি হেসে বলল, অবশ্যই দেখা যাবে স্যার – এটা আমাদের একটা রিসার্চ প্রজেক্ট – সরোবর উদ্যান।

ছাদে উঠে আনমনা হয়ে গেলেন চৌধুরি সাহেব। সবুজ দেখে হারিয়ে গেলেন তার ছেলেবেলায়। তখনও শহর এতটা প্রাণহীন হয়নি। প্রায় পাড়াতে একটা শিউলি গাছ পাওয়া যেত। আম বা পেয়ারার সবুজ মাথা মেলত ছাদ পেরিয়ে।

হাঁটতে হাঁটতে আনমনেই একটা গাছের পাতার একটুখানি ছিড়ে নিলেন। ছেড়ার পরেই নাকে ভেসে আসল মিষ্টি একটা গন্ধ। চেনা গন্ধ। অতীতে ভেসে বেড়ানো মন ফিরে আসল বর্তমানে।
চিন্তা চলছে – কোথায় পেয়েছি এই গন্ধ আগে?
পুদিনা? উঁহু – “পুদিনা তো এটা” আপনমনে বলে তিনি পুদিনার একটা পাতা তুলে শুকলেন। ফারাক আছে।
তুলসী গাছ দেখলেন ছাদে। কিন্তু এই পাতাটা তার থেকেও আলাদা।

– এই পাতাটার নাম কী?
– “এ গাছটার নাম ব্যাসিল”, সরোবর প্রকৌশলের কর্মী জানাল। এটা একটা ভেষজ গাছ। বাসিলের শুকনো পাতার গুড়ো ইতালিয়ান ডিশগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই ব্যবহার হয়। আমাদের দেশে পাওয়া রেডিমেড স্যুপ কিংবা নুডলসের মশলাতে বাসিলের ঘ্রাণ পেয়ে থাকবেন।

সাথে সাথে বুঝতে পারলেন চৌধুরি সাহেব – এই গন্ধ তিনি কোথায় পেয়েছিলেন। স্ত্রীর পাস্তা থেকে – বেশ চনমনে খিদে জাগিয়ে দেয়া গন্ধ।

এই ব্যাসিলসহ আমাদের সবগাছগুলোই অরগানিক, বলল ছেলেটা।

– মানে?
– আমরা কোনো সার বা কীটনাশক ব্যবহার করি না।
– তাহলে গাছ পুষ্টি পায় কোথা থেকে?
– পানি থেকে। সরোবর উদ্যানে কিন্তু কোনো মাটি নেই।

মাটি ছাড়া গাছ!! আশ্চর্য হলেন চৌধুরি সাহেব।

– জি স্যার। এই প্রযুক্তির নাম অ্যাকোয়াপনিক্স। গাছগুলো ঝামা ইটের খোয়াতে শিকড় ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর ঐ যে দেখছেন একটা পাইপ – ওটা দিয়ে সরোবর থেকে পানি আসে। পানিতে মিশে আছে অ্যামোনিয়া। এই অ্যামোনিয়া এই ঝামা ইটে বসবাস করা ব্যাকটেরিয়া দিয়ে ফিল্টার হয়ে নাইট্রেটে রূপান্তরিত হয়। ওটাই গাছের সার হিসেবে যথেষ্ট।
– আর ওই মাছগুলো খাওয়া যায়?
– কী বলেন স্যার? আমাদের একটা তিলাপিয়ার ওজন ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়েছিল। আর এই মাছের যে কী স্বাদ, তা শুধু পুকুর থেকে সদ্য তুলে ধরা মাছের সাথেই তুলনীয়।

চৌধুরি সাহেব কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখলেন মাছেদের খেলাধূলা।
স্ত্রীর কথা চিন্তা করে চৌধুরি সাহেব বললেন, আমাকে কয়েকটা ব্যাসিল পাতা দেবে?

– অবশ্যই দেব স্যার। আর আপনি ইচ্ছা করলে আমাদের ব্যাসিল পাতার গুড়ো কিনে নিয়ে যেতে পারেন। লম্বা সময় ধরে সিজনিং হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।
– ওহ তাহলে তো চমৎকার। আমি সুপার শপগুলো থেকে কিনেছিলাম একবার। তবে সেটা অরগানিক ছিল কিনা জানি না। তার মানে তোমরা রুক্ষ ছাদকে শুধু সবুজই করছ না সেখান থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদও করছ?

লাজুক হেসে ছেলেটা বলল, জি স্যার, আলহামদুলিল্লাহ! আর যাদের ছাদ নেই তাদের বারান্দার জন্য আমরা ‘ক্ষুদে সরোবর উদ্যান’ বানিয়েছি। দাম মাত্র ২০ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিল-ও খুব বেশি আসবে না।

মাছগুলোকে খেতে দিয়ে চৌধুরি সাহেব চিন্তা করলেন তিনিও একটা ক্ষুদে সরোবর উদ্যান বসাবেন তার বারান্দায়। তার সন্তানেরা মাছ উৎপাদন করবে, নিজের হাতে সবজি ফলাবে – খাবারের মূল্য বোঝানোর জন্য উৎপাদনশীল হওয়া জরুরি।

আবার আনমনা হয়ে গেলেন চৌধুরি সাহেব। এই শহরের কংক্রিটের জঙ্গলের ছাদ ছাপিয়ে সবুজ দেখা যাবে আবার – সরোবর উদ্যানের কল্যাণে সেটা সম্ভব হবে কি?

Total number of views: 7

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmailFacebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *