শুধুই কী ব্যবসা — ২

16427768_902059753263526_4403819730593762920_n

বেশ কয়েকবছর আগের ঘটনা। মুহাম্মাদপুরের আল-আমীন মাসজিদ। মাসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে বেরিয়ে আসা মুসল্লিদের হাতে লাল বাঁধাকপি তুলে দিচ্ছে। দাম কত? দাম দেওয়ার দরকার নেই – এমনিই, ফ্রি !
কেন এই অবাক ঘটনা? পেছনের কাহিনীটা একটু করুণ।
ছেলেটির বাবা ‘নতুন কিছু করো’- এই আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকা থেকে কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন দুর্লভ লাল বাঁধাকপির বীজ। বেশ অনেক টাকা খরচ করে জমি চাষ করলেন, সার দিলেন, সেচ দিলেন। বিক্রির সময় দেখেন – কেউ কেনে না।
বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসার সময় বস্তা ভরে আনলেন বিশালাকার লাল বাঁধাকপিগুলো। নিয়ে গেলেন দেশের অন্যতম বড় একটি চেইন সুপারশপে। অনেক বলে কয়ে ওরা নিল ২৫টা বাঁধাকপি। কৃষক জানতে চাইলেন দাম কত দেবেন? ২০ টাকা প্রতি পিস। মনটা দমে গেল। তা-ও রাজি হলেন। কবে টাকা দেবেন? বিক্রি হবার পরে।
চেইন সুপারশপটি বাঁধাকপি বিক্রি করেছিল ৫০-৬০ টাকা প্রতি পিস দরে। কৃষক শুধু অনুরোধ করেছিলেন আরেকটু দাম কমালে বোধহয় আরেকটু তাড়াতাড়ি বিক্রি হয়ে যেত। কয়েকদিন পরে গেলেন দাম আনতে। তাকে জানালো হলো যার সাথে তার চুক্তি হয়েছিল তিনি আর নেই। পরে আসেন। ৫০০ টাকা, মাত্র ৫০০ টাকা – সেটার জন্যই পরে আসেন। আর সুপার শপে দেবেন না, পণ করলেন তিনি। তবে এত দামী কপিগুলো গরুতে খাবে? তিনি তাই জেদ করে সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকায় মাসজিদের মুসল্লিদের খাইয়ে দেওয়ার।
এ তো গেল একজন কৃষকের কথা। বাংলাদেশে এমন কৃষকের সংখ্যা লাখে নয় কোটিতে। এদের ঘামটা দেখা যায় মৌসুমের শুরুতে, তবে মৌসুমের শেষে অশ্রুটা অবশ্য শহুরে চোখে দেখা যায় না।
সরোবর থেকে টকপি বানানোর সিদ্ধান্ত তখন থেকেই।
কারো হাতে জিম্মি হয়ে বিক্রি করা, বা বিক্রি করে টাকা না পাওয়া নয়। অনেক টাকার ফসল অসহায় হাতে গরু-ছাগলকে খাইয়ে দেওয়া নয়। ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা। বিক্রি করতে না পারলে সারাবছর সংরক্ষণ করা। খুব সাধারণ মানের প্রসেসিং করা যাতে ভ্যালু এড হয় কিন্তু খাবার বিষময় না হয়ে স্বাস্থ্যকর হয়।
আমরা টকপি এবং কিমচি বানাই এবং বিক্রি করি শুধু ব্যবসা করার জন্য না। আমরা চাই সারাদেশের সাধারণ কৃষকেরা যেন টকপি বানানো শেখে। আমরা চাই সারাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে যেন কিমচি এবং টকপির মতো স্বাস্থ্যকর খাবারগুলো ঢোকে। আমরা সে উদ্দেশ্যে এই খাবারটি একেবারে মাঠ পর্যায়ের মানুষদের মাঝে বিতরণ করেছি। আমরা স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের সবচেয়ে গরীব মানুষটির যেন এক থালা ভাত থাকে, ডাল না থাক, পাতের কোনে সালুন হিসেবে যেন একটু টকপি বা কিমচি থাকে।
সরোবরে সামাজিক ব্যবসার সংজ্ঞা এই স্বপ্নগুলোকে কেন্দ্র করেই।

Total number of views: 311

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmailFacebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *