শুধুই কী ব্যবসা — ১

14523132_824405997695569_6644013053820672813_n

আমরা বলি সরোবর সামাজিক ব্যবসা করে। সেটা কি?

সামাজিক ব্যবসা বলতে আমরা বুঝাই এমন ব্যবসা যা সমাজের মানুষদের চাহিদা পূরণ করে কিন্তু কোনো মানুষকে বঞ্চিত বা শোষণ করে নয় বরং সবার সাথে ন্যায্য মূল্যের ভিত্তিতে।

কেন?

একটা উদাহরণ দিই। ঝালকাঠিতে খুব ভালো পেয়ারা হয়। ৬৫০ হেক্টর বিস্তৃত বাগানে কয়েকশ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় এ চাষ হয়ে আসছে। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় এই পেয়ারা পুষ্টিমাণ সমৃদ্ধ বলে একে ভালোবসে সেখানে বাংলার আপেল বলে ডাকা হয়।

এবার দেখি বাস্তবতাঃ

// শতদশকাঠি গ্রামের শিপলু হালদার বলেন, আমার এক একর ২৫ শতাংশ জমিতে পেয়ারার বাগান রয়েছে। ফলনও ভাল হয়েছে। মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পেয়ারার চাষ করেছি। স্থানীয় বাজারে পেয়ারা পানির দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা পেয়ারা মহাজনদের কাছে বিক্রি করি। মহাজনরা দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এতে মধ্যত্বভোগী মহাজন ও পাইকাররাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীর মত বড় শহরে এ অঞ্চলের পেয়ারার কেজি ৫০/৬০ টাকা হলেও এখানে তা বিক্রি হচ্ছে ৫/৬ টাকায়।

এক মণ পেয়ারার টাকায় পাঁচ কেজি চাল মিলছে না।
পেয়ারার আড়তদার কালু হালদার বলেন, এখন পেয়ারার ভরা মৌসুম চলছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চাষিদের কাছ থেকে আনা পেয়ারা দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এখন ৪/৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হলেও কিছুদিন পরে দাম পরে যাবে। তখন এক টাকা কেজি দরেও পেয়ারা বিক্রি করতে হবে। //
অর্থাৎ আমরা দেখছি চাষীরা, অর্থাৎ উৎপাদনকারীরা তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। এবার দেখি ভোক্তাদের দিকে।
// পেয়ারা চাষি ভবেন্দ্রনাথ হালদার বলেন, প্রাণ কোম্পানি জেলি তৈরির জন্য এ বছর চাষিদের কাছ থেকে কিছু পেয়ারা কিনেছে। প্রতিবছর তাদের মত বড় বড় কোম্পানি যদি জেলি তৈরির জন্য এখান থেকে পেয়ারা কিনতো তাহলে আমরা বেশি লাভবান হতাম। //

এবার তাহলে আমাদের মনে হতে পারে, এই যে প্রায় প্রতিটি মুদি দোকানে বয়াম ভর্তি জেলি আছে সেটা তাহলে কী? এত বছর ধরে তাহলে বড় বড় জেলি কোম্পানিগুলো জেলি বানাচ্ছে কী দিয়ে?

বাংলাদেশে জেলির উৎপাদনটা আসলে পেকটিনকে কেন্দ্র করে। বিদেশ থেকে আমদানি করা পেকটিন এর পাউডার হচ্ছে বাজারে পাওয়া জেলির মূখ্য উপাদান। এর সাথে মেশানো হবে ফ্লেভার, রং এবং চিনি।
অনেকে বলতে পারেন, পেকটিন কী খারাপ জিনিস? উত্তরে বলতে হবে, না। কারণ পেকটিন তৈরি হয় আসলে ফল থেকেই। কাচা আপেল কিংবা লেবু জাতীয় ফলের খোসায় প্রচুর পেকটিন থাকে। এইসব ফল যেখানে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয় সেখানে বিশাল বড় বড় কারখানাতে বাণিজ্যিকভবে পেকটিন পাউডার তৈরি হয়। জ্যাম-জেলি বানিয়ে বোতলে ভরে রপ্তানি করার চেয়ে পেকটিন পাউডার বানিয়ে বিপণন যেমন সহজ, আবার এর সাথে ফ্লেভার মেশালেই নানারকম জেলি তৈরি করা যায়। জ্যাম তৈরি করতেও পেকটিন লাগে। এছাড়াও অনেক তৈরি খাবারে জমাট বাধার জন্য পেকটিন ব্যবহার হয়।

দাম কমানো এবং উৎপাদন বাড়ানোর এই পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যায় খাবারের প্রাণ। যেই জেলির শুরু হয়ত হয়েছিল দ্রুত পচনশীল একটা ফলকে সারা বছর ধরে খাবার বাসনায়, সেই জেলি এখন তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে। হয়ত সেই সুদূর অস্ট্রেলিয়ার আপেল থেকে তৈরি পেকটিন আমরা জেলি হিসেবে খাচ্ছি, কিন্তু আমাদের পেয়ারা ঠিকই পচে যাচ্ছে আজ-ও।
আমাদের সামাজিক ব্যবসায় আমরা বৈশ্বায়নজনিত খাদ্য প্রাণহীনতা থেকে বের হতে চাইছি। আমরা জেলি বানাই পেয়ারা থেকে। এর সাথে লেবু মিশিয়ে, চিনি মিশিয়ে। জেলিটাকে একটু লম্বা সময় ধরে খাওয়ার জন্য আমরাও প্রিজারভেটিভ মেশাই, তবে শুধু সেগুলোই যেগুলো শরীরের ক্ষতি করে না–স্বল্প পরিমাণে সোডিয়াম বেনজোয়েট কিংবা ভিনেগার অর্থাৎ অ্যাসেটিক এসিড।
আমরা ম্যাস প্রডাকশন করি না বিধায় আমাদের উৎপাদন কম। আমাদের জেলিতে পেয়ারা আছে বিধায় আমাদের জেলির দাম বেশি। আমাদের মূলধন সীমিত বলে আমরা একবার যা তৈরি করেছি সেগুলো বিক্রি করে আবার পুনরায় উৎপাদনে হাত দিই। আমাদের স্টক বছরের পর বছর পরে থাকে না, কয়েকমাসেই শেষ হয়ে যায়। শেষ হয়ে গেলে আমরা বলি, এ বছরের মতো শেষ, সামনের বছর আবার ইন শা আল্লাহ।
আমাদের বিশ্বাস এই পৃথিবীতে এখনও কিছু মানুষ আছেন যারা খাবারে প্রাণ খোঁজেন, স্বাদ খোঁজেন, প্রাকৃতিক ছোঁয়া খোঁজেন, পুষ্টি খোঁজেন। আলহামদুলিল্লাহ, সত্যি সত্যি এমন কিছু মানুষ আল্লাহ আমাদের মিলিয়ে দিয়েছেন।

আমাদের স্বপ্ন কী?
আমরা শুরু করি একদম ছোট দিয়ে। গ্রীন ম্যাংগো সস কিংবা পেয়ারার জেলি–ক্রেতারা যখন কোনো পণ্য পছন্দ করেন তখন আমরা সেটার উৎপাদন বাড়াই। এমন যদি হয়, কোনো পণ্যের সারা বছরব্যাপী চাহিদা তৈরি হলো তখন আমরা বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাব। কিন্তু গেলেও আমাদের উদ্দেশ্যগুলো হারিয়ে যাবে না ইন শা আল্লাহ।
আল্লাহ চাইলে হয়ত কোনো এক দিন ঝালকাঠির ভীমরুলী গ্রামে সরোবর একটা জেলি কারখানা স্থাপন করে ফেলবে।

ছবিঃ
১। ভীমরুলী গ্রামের ভাসমান পেয়ারা হাট, ছবি কালের কন্ঠ।

Total number of views: 274

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmailFacebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *