শপ

11226558_626198517516319_2867721960043252864_n

গুড-উইল শপের সাথে পরিচয় প্রথম অ্যামেরিকাতে। প্রফেসর বললেন, শীত আসার আগে গিয়ে দেখে আসতে–খুব অল্প দামে ভালো গরম কাপড় পাওয়া যায়। গিয়ে সত্যি চোখ ছানাবড়া। ২ ডলারে প্যান্ট, ৫ ডলারে জ্যাকেট!

বঙ্গ থেকে নর্থফেসের জ্যাকেট (দুই নম্বর, তবে দেখে কিনলে ভিক্টোরিয়া বা নর্থ ফেসের আসলটাও পাওয়া যেতে পারে) কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। শেষমেশ তাই গুড-উইল শপ থেকে কিছু কেনা হয়নি। তবে দেশে ফিরে আসার সময় টাইটস সহ অনেক শীতের কাপড় গুড-উইল শপে দিয়ে আসি। দেশের শীতে ওগুলো অর্থহীন।
বাংলাদেশে পুরনো কাপড় নিয়ে দুটো প্রজেক্ট করেছিলাম আমরা। দুটোরই অভিজ্ঞতা খারাপ। ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া পুরনো কাপড় উত্তরবঙ্গের হাড় জিরজিরে মানুষের গায়ে মাপমত দেয়া বিশাল ঝক্কির ব্যাপার। পুরনো কাপড় বিক্রির প্রজেক্টটাও খুব ভালো চলেনি একই কারণে।

এদিকে আমাদের বাসাগুলোতে কাপড়ের পাহাড় জমছে প্রতিনিয়ত। বাচ্চারা বড় হয়ে যাওয়ার ছোট ছোট কাপড়। উপহার হিসেবে পাওয়া তেমন-পছন্দ-নয় জাতের কাপড়। শার্ট-প্যান্ট তেমন না পড়ায় জমে যাওয়া প্রচুর কাপড়।
মানুষকে পুরনো কাপড় দেওয়ার বেশ কিছু সমস্যা আছে। প্রথমত, রসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন আমাদের বোন বা ভাইদের জন্য তাই পছন্দ করতে যা আমি নিজের জন্য করি। কিন্তু আমরা যা দিয়ে দিচ্ছি তা আমরা সাধারণত পছন্দ করি না বলেই দিচ্ছি, খেয়াল করছি না যাকে দিচ্ছি তার আসলেই পছন্দ হচ্ছে কিনা।
দ্বিতীয়ত, যাদের দেওয়া হচ্ছে তাদের আত্মসম্মানে লাগে। পরিচিত একজন মানুষের ব্যবহৃত পরিধেয় বস্ত্র অনেকের জন্য অস্বস্তিকর। আবার গরীব মানুষটা চক্ষুলজ্জাতে কিছু বলতেও পারছে না, নিতে বাধ্য হচ্ছে, পাছে সামর্থ্যবান মানুষটি ‘মাইন্ড’ করেন।
তৃতীয়ত, আমরা যাদের চিনি তাদের গায়ে আমাদের কাপড়গুলো মাপমত হয় না। অনেক সময় রুচির তফাত থাকে অনেক।
চতুর্থত, আমরা যখন আলমারি ফাঁকা করছি তখন কাপড় নেওয়ার লোক নেই। আবার আমরা যাদের দিচ্ছি তাদের যখন কাপড় কেনা দরকার তখন তারা মুখ ফুটে চাইতে পারে না।
অথচ আমাদের অনেক বোন আছে যারা একটা মাত্র বোরখার নীচে দু-সেট সালোয়ার কামিজ ব্যবহার করেন। সেটা পরেই তারা কলেজ যাচ্ছেন, ছাত্রী পড়াতে যাচ্ছেন। কোনো কারণে বোরখা খুলতে হলে তারা ইতস্তত বোধ করেন–ভেতরের কাপড়টা এতই জীর্ণ। ঢাবির হলে থাকত, গ্রাম থেকে এসেছে এমন অনেক সহপাঠিদের একটা শার্ট এবং আরেকটা টিশার্ট দিয়ে ছাত্রজীবন চালিয়ে দিতে দেখেছি। রিকশাওয়ালাদের ছেড়া জামা আর হকারদের লুঙ্গির কথা আর নাই বললাম–এগুলো আমাদের সবার নিজেদের চোখেই দেখা।

বাংলাদেশে ফিরে এসে শীতে পাওয়া পুরনো কাপড় (যেগুলো আদতে শীতের কাপড় নয়) নিয়ে যখন আমরা ত্যক্ত, তখন মাথায় আসল গুড-উইল শপের কথা। আমরা এমন একটা দোকানের কথা চিন্তা করলাম যেখানে মানুষ শুধু শীত বা বন্যার সময় নয়, বছরজুড়ে কাপড় দিতে পারবে, ঘর ফাঁকা করবে। কাপড় সহ পুরনো জিনিসগুলো বছরজুড়ে বিক্রি হবে খুব কম দামে। যাদের যা পছন্দ সে সেটা টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যাবে। ব্যবহারের সময় আত্মতৃপ্তি থাকবে—এটা দান নয়, নিজের পরিশ্রমের টাকা দিয়ে কেনা।

আমরা খুলে ফেললাম রিসাইকল শপ। এক ভাই দিলেন দোকান-অফিস-গুদাম ইত্যাদির অগ্রিম ভাড়া। দিলেন দোকানের ডেকোরেশনের খরচ। কাপড়-জুতা থেকে শুরু করে ঘরের যাবতীয় পুরনো জিনিস দিতে শুরু করলেন অনেকেই। আলহামদুলিল্লাহ।
এই রমাদানে যখন আমরা বিক্রি শুরু করলাম তখন মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে সত্যি সত্যি জান ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ইনফিনিটির একটা শার্ট (আল্লাহই জানেন আসল দাম কত) ৬০ টাকা! পোলো শার্ট যা রাস্তাতে বিক্রি হয় ৪৫০ টাকাতে সেটার দাম ৩০ টাকা! কাতান শাড়ি ১০০ টাকা!! বোরখা ৬০ টাকা!!
দুটোর বেশি কেনা যাবে না – এই নিয়মটা না রাখতাম একদিনে দোকান খালি হয়ে যেত। কিন্তু আমরা চাই সবাইকেই কেনার সুযোগ দিতে। বিশেষত সমাজের সবচেয়ে গরীব যারা তাদের। আমাদের হ্যান্ডবিল তাই বিলি হয়েছে বস্তি আর রিকশার গ্যারেজেই। এমনকি দোকানটা নেওয়া হয়েছে এমন এলাকার এমন জায়গায় যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষদের যাতায়াত আকসার।
অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন—দানের জিনিস বিক্রি কেন? মূলত, দোকানের খরচ—ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন ইত্যাদি দেওয়ার জন্য। এছাড়া পণ্যগুলোকে ধোলাই-ইস্ত্রী করার খরচ আছে। আছে নানারকম পরিবহন খরচ।

আমরা যে দামে বিক্রি করছি তাতে খরচ উঠবে কিনা আল্লাহই জানেন। যদি ওঠে তবে আমরা লাভের টাকা দিয়ে কিছু মানুষকে কারিগরী শিক্ষা দেব ইন শা আল্লাহ।
তবে সরোবরের অন্য সবকিছুর মতো এখানেও আমরা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করি না আমাদের পুরনো কাপড় দিয়ে যেতে। আমরা চাই আপনি যেন চারপাশের মিসকিনদের খুঁজে খুঁজে দান করেন। কারো যদি গায়ে লাগে এবং পুরনো কাপড় নিতে আপত্তি না থাকে অবশ্যই আমাদের কাছের মানুষদের হক আগে। যে স্যান্ডোগেঞ্জি পড়া রিকশাওয়ালার রিকশাতে চড়ে বাসায় ফিরিলেন তাকে জিজ্ঞাসা করুন আপনার পুরনো একটা টি-শার্ট নেবে কিনা। যদি নেয়, তাকে দেন। দেওয়ার সময় দুটো ভালো কথা বলেন। তাওহীদ নিয়ে, সলাতের গুরুত্ব নিয়ে, পৃথিবীতে আসার কারণ নিয়ে এমন কিছু তাকে বলেন যেটা সে অন্য কখনও কারো কাছে শুনতে পায়নি। ব্যক্তিগত দেওয়া, যার সাথে মঙ্গল কামনা মিশে আছে—সেটা সবসময় কাজে দেয়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ছোট থেকে বড় হওয়ার সময় অনেক পুরনো কাপড় পড়েছি। আমার ছেলেরাও পড়ে। ফোর্ট ওয়েইনের বরফে হাঁটার পরে ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া কেডস আর জুতোর তলা দুদিনেই দুখন্ড হয়ে গিয়েছিল। পায়ের ভেতরে তুষার ঢুকে মোজা ভিজে চুপচুপে। অনলাইনে নতুন জুতোর অর্ডার দিয়েছি—আসতে লাগবে তিনদিন। পরদিন কীভাবে ভার্সিটি যাব? নগদে আমি আমার প্রফেসরের কাছ থেকে তার পুরনো এক জোড়া ফরম্যাল জুতো নিয়ে নিলাম। এখনও যখন কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় জুতো জোড়া পরি, আমার সেই স্যারের কথা মনে পড়ে। ৫৭ ডলার দিয়ে কেনা এইসিক্সের স্নিকারে নয়, উপহার পাওয়া জুতোটাতেই বরং আত্মীয়তার ছোঁয়া লেগে আছে।

তবে যাদের এমন ব্যক্তিগত পরিচয় কম, বা একদম প্রথম দিকে উল্লেখ করা সমস্যাগুলো আছে তারা সরোবর রিসাইকল শপে দিয়ে যেতে পারেন। সারাবছর।
তার মানে কী যারা সামর্থ্যবান তাদের জন্য সরোবরের শপে কিছু নেই? তারা কী শুধু এসে পুরনো জিনিস দিয়ে চলে যাবেন? তা নয়। সরোবরের মূল কাজ কিন্তু হালাল ব্যবসার দিকে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। নতুন উদ্যোক্তাদের একটা পাটাতন দেয়া।

আমাদের এক বোন EEE থেকে পাশ করে দুটো বাচ্চাকে নিয়ে গড়া সংসার দেখাশোনা করছেন। ‘ইহুদি-পণ্য বর্জন করুন’ শিরোনামের পোস্ট দেয়ার চেয়ে তিনি চিন্তা করলেন ইউনিলিভারের শ্যাম্পু বা কন্ডিশনারের কী বিকল্প আছে। চুল এবং চুলের পুষ্টি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করে ফেললেন তিনি। আমলকি, বহেরা, হরতকি, মেথি, রিঠা, শিকাকাই এবং আরো কিছু প্রাকৃতিক উপাদান একসাথে গুড়ো করে তিনি একটা দানাদার মিশ্রণ বানালেন। এরপর সেটা ডিমের সাদা অংশের সাথে মিশিয়ে মেখে দেখলেন ফলাফল কী? চমৎকার! এরপর কাছের মানুষদের উপরে পরীক্ষা। যাদের খুশকির সমস্যা তাদের জন্য ডিমের বদলে টক দই। যাদের চুল শুষ্ক তারা মেশাবে মধু। ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ভালো ফিডব্যাক পাওয়ার পরে তিনি ফেসবুকে একটা পেজ খুলে বিক্রি শুরু করলেন। সাথে রাখলেন হেয়ার ওয়েল নামের আরেকটি পণ্য।
আমরা আমদের এই বোনটার এই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালাম। আমাদের দোকানের তাকে জায়গা পেল তার পণ্যটি। অথচ একটি বা দুটি পণ্য বিক্রির জন্য দোকান নেওয়া, ভাড়া দেওয়া, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া—অসম্ভব। কিন্তু সরোবরের সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে এই বোনের মতো শত ভাই-বোনের পণ্যটা পৌছে দেওয়া খুবই সম্ভব।

বিভিন্ন মানুষকে স্বাবলম্বী হওয়ার উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি আমরা তাদের ব্যবসায়িক পরামর্শ দিয়েছি। যাদের মূলধন দরকার ছিল তাদের প্রয়োজনীয় পুঁজি যোগাড় করে দিয়েছি। যথাযথ পরিসরে প্রচারণা চালিয়েছি। বিপণন এবং বিক্রির চুড়ান্ত স্থানটি হলো সরোবর শপ। এখন বিক্রি হওয়া আচার-মধু-ঘি-সরিষার তেল-টি শার্ট সবকিছু এভাবেই ঠাঁই পেয়েছে সরোবরের শপে।

আমরা এখন এক ভাইয়ের সাথে কাজ করছি শিশু-খাদ্য নিয়ে। ঈদের পরে সেটি পাওয়া যাবে ইন শা আল্লাহ। সামনে আরো পণ্য আসবে, আরো মানুষকে তাদের রিযক অন্বেষণে সাহায্য করবে সরোবর শপ। টাকা কামানোর মেশিনে পরিণত হওয়া মাল্টিন্যাশনালগুলোর বিপক্ষে এটা আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। ন্যায্য মূল্য এবং বিশুদ্ধতার এই সমন্বয়ে সবাইকে স্বাগতম।

আমাদের ঠিকানা ২৯৪/২-এ তিলপাপাড়া, ৫ নম্বর রাস্তা, খিলগাঁও। রেলগেট থেকে সামান্য ভেতরে গোড়ানের দিকে যেতে পাঁচ নম্বর গলিটাতেই আমাদের দোকান। সবাইকে যে কিছু কিনতে অথবা কিছু দিতে আসতে হবে এমন কথা নয়। আমাদের দোকানের পাশের নামাযের ঘরটাতে দুরাকাত সলাত পড়ে আমাদের জন্য দু’আ করে যাবেন—এটাই কামনা।

– শরীফ আবু হায়াত অপু, সরোবরের পক্ষ থেকে।

Total number of views: 245

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmailFacebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmail

7 thoughts on “শপ

  1. লেখাটা পড়ে আপনাদের আন্তরিকতার পরশ যেন আমাকেও ছুঁয়ে গেল।আল্লাহ্ আপনাদের কবুল করে নিবেন -আল্লাহ্ র কাছে এটাই চাইব।

  2. টাকা কামানোর মেশিনে পরিণত হওয়া মাল্টিন্যাশনালগুলোর বিপক্ষে এটা আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। ন্যায্য মূল্য এবং বিশুদ্ধতার এই সমন্বয়ে সবাইকে স্বাগতম।
    চমতকার উদ্যেগ।

  3. ক’জনই বা পারে এমন উদ্যোগ নিতে।
    ভালবাসার সাথে দোয়া রইল।
    অনেক অনেক শুভ কামনা…..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *