রেজালা মিক্স

rejala

১. অন্তনুর ভীষণ মেজাজ খারাপ। এই মূহুর্তে ক্যামিস্ট্রি ক্লাস শেষ করে কলেজ-বারান্দার রেলিং ধরে বসে আছে সে। ওয়ালিউল্লাহ স্যার কেন যে এত বাড়াবাড়ি করেন সেটা তার বুঝে না। ক্লাস টেস্টের সময় আরিফ এক অক্টেন হাইড্রোকার্বনে কয়টি কার্বন পরমাণু আছে এটা জিজ্ঞেস করেছিলো অন্তনুকে। ফিরে তাকাতে মূহুর্তেই খাতা গায়েব! ক্লাস টেস্টটাই এটেন্ড করা গেল না। অথচ এই টেস্টের মার্ক ফাইনাল টেস্টে যোগ হবে। বিষন্ন লাগছে তার।

আরিফের ফোনে চিন্তায় ছেদ পড়ে অন্তনুর।

-কিরে রাতের প্ল্যান ঠিক আছে তো? তোর রেজালা খাবার ব্যবস্থা করে ফেলেছি। শুধু ব্যাগে একটা পাঞ্জাবি আর কনফিডেন্টলি ঢুকে যাওয়া। চোরের মত ভাবভঙ্গি একদম করবি না। খবরদার। হাসিহাসি মুখ করে খেতে বসে যাবি। ব্যাস।
-ঠিক আছে।
-সময়মত চলে আসবি কিন্তু।
-হু।

২. রোকেয়া গাড়ির ড্রাইভার এর জন্য আধ ঘন্টা যাবত রেডি হয়ে বসে আছেন, ড্রাইভার সাহেবের কোন খবর নেই। আজ উনি যে স্কুলে চাকুরী করেন সেই স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডামের মেয়ের বিয়ে। স্কুলের সব টিচাররা যাচ্ছেন সেখানে।

কি ব্যাপার আকবর তোমাকে এতক্ষন থেকে ফোন দিচ্ছি। তোমার আসার কথা ৭.৩০ টায়। এখন বাজে ৮ টার উপর। বারবার বলেছি দেরি হয়ে গেলে রিকশা নিয়ে চলে আসবা। অযথা হাঁটবা না। ভাড়া আমি দিব।
অপর পাশের জবাব স্পষ্ট বোঝা গেল না। কেবল এইত্তো আইয়া পরছি খালাম্মা জাতীয় কিছুর উত্তর মনে হল।

৩. রোকেয়া জুনিয়ার সেকশনের সব টিচারদের সাথে এক টেবিলে বসে আছেন। মাত্র খাবার সার্ভ করা হলো। পোলাও, রোস্ট, খাসির রেজালা আর কাবাব। অদ্ভুত সুন্দর একটা ম ম গন্ধ চারপাশে।

-এই রোকেয়া দেখতো ওই ছেলেটাকে অন্তনুর মত লাগছে না?
রোকেয়ার কলিগ শিউলি তীব্র কন্ঠে জানালেন রোকেয়াকে। রোকেয়া সবে মাত্র রোস্টে কামড় বসিয়েছেন।
-আরেহ, হ্যাঁ অন্তনুই তো।

৪. অন্তনু রেজালার বাটি থেকে বড় দুই টুকরো মাংস নিয়ে মাত্র ঝোল নেবার জন্য হাতটা বাড়িয়েছে। ঠিক এ সময় অন্তনুর মাথায় হাত রাখলেন রোকেয়া।
হাত বুলিয়ে বিদ্রুপ করলেন যেন–
-কি রে অন্তু রেজালাটা খুব মজা; তাই না? আমি তো দুই টুকরো খেয়ে ফেললাম। ঠিক আছে বাবা খা ভালো করে। রাতে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।

৫. অন্তনু তার রুমের ছোট টুলটার উপর মাথা নিচু করে বসে আছে। বিছানার পাশে রাখা মৃদু টেবল ল্যাম্পটা জ্বলছে। চারদিকে ইন্টোগ্রেশন সেল টাইপ পরিবেশ।
বাবা মা দুজনই সামনে দাঁড়ানো।
রোকেয়ার রাগে মুখ লাল করে রেখেছেন। তার মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না।
অন্তনুর বাবা রোকেয়া কে বললেন ‘আচ্ছা তুমি রুমে যাও আমি কথা বলছি।’
তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেলেন রোকেয়া।

কি রে বাবা এমন কাজ কেন করলে? তোমাকে তো এমন শিক্ষা দেয়া হয় নি। অন্তত আল্লাহ্‌কে ভয় করা উচিৎ ছিলো তোমার। জোর করে অতিথি হবার হাদিস টা মনে আছে তো তোমার তাই না?

-জ্বি বাবা।
-এমন একটা কাজ কেন করলে বাবা?
-বাবা আই এম সরি। আসলে বিয়ে বাড়ির রেজালা খেতে খুব ইচ্ছা করছিলো। আর আরিফও বললো চল্ কিছু হবে না। তাই…কথা শেষ করতে পারে না অন্তনু। খানিকটা অপরাধবোধ আর একরাশ লজ্জা ঘিরে ধরেছে অন্তনু কে।

-তোমার মা কে সরি বলো। আমাকে না বললেও চলবে। তোমার মা সবার সামনে কত ছোট হয়েছে বুঝতে পারছো তো?

৬. প্রায় দুই দিন রোকেয়া ছেলের সাথে কোন কথা বলেন নি। অন্তু মুখ ছোট করে আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। একবার সরিও বলেছে। আজ উনি ঠিক করেছেন ছেলেকে ছোটোখাটো একটা সারপ্রাইজ দিবেন। কালই সরোবর এর শপ থেকে রেজালা মিক্স কিনে এনেছেন তিনি। আজ শুক্রবার, তাই স্কুলও বন্ধ।

অন্তনু কোচিং থেকে ফেরার আগেই প্যাকেটের গায়ে থাকা ইন্সট্রাকশন দেখে রান্না করে ফেলেছেন রোকেয়া। পদ্ধতিটা বেশ সহজ ই লেগেছে তার কাছে। ওনার রান্না মোটামুটি টাইপের হলেও আজ নিজের রান্নায় নিজেই মুগ্ধ তিনি। তাই খানিক আনন্দ বোধ করছেন তিনি।

পোলাও রান্নাটা অবশ্য এখনও বাদ আছে। অবশ্য এটা তেমন ঝামেলার কোনো বিষয় না, চালের চেয়ে ডাবল পানি দিয়ে চুলায় বসিয়ে দেয়া। ব্যস ঝরঝরে পোলাও তৈরি।

ছেলের বিস্মিত হওয়া চেহারাটা রোকেয়া স্পষ্ট দেখতে পারছেন চোখের সামনে। আহারে বেচারা!

৭. অন্তনু খাবার টেবিলের মাঝখানের চেয়ারে বসে আছে। ওর মুখ কিঞ্চিৎ হা হয়ে গেছে। বাবা মা ওর দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছেন। অন্তনুর গলার কাছে কেমন কান্না কান্না লাগছে। মা গুলো এমন অদ্ভুত টাইপ ভালো হয় কেন কে বলতে পারে। ও এমন করে ভালোবাসতে পারবে কিনা ওর মাকে ওর জানা নাই।

Total number of views: 41

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmailFacebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *