ফিরে দেখা – ইফতার প্রজেক্ট ২০১৭

1

২৪ মে ২০১৭, রাত ১০ টা। গাবতলিতে শাহ আলী পরিবহনের জন্য অপেক্ষমান।
উদ্দেশ্য লালমনিরহাটের ৫ টি গ্রামে ২৫৮৪ জনের মাঝে ইফতার প্যাকেজ বিতরণ।
সফর সঙ্গী রাশেদুল, রিগান এবং সারোয়ার।
রংপুরের নেমে আমরা দুটো দলে ভাগ হয়ে গেলাম। মোটর সাইকেল যোগে গ্রামের মেঠো পথ ধরে প্রথম গন্তব্যস্থল লালমনিরহাটের রাজপুরে পোঁছালাম। আমরা পোঁছানোর পূর্বেই চাংড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়েছিল তিস্তা চরের শত শত উৎসুক জনতা। তাদের চোখে মুখে ভেসে আসছিল আনন্দের স্রোত।
স্থানীয় রবিউল ভাইয়ের তৈরিকৃত তালিকায় ২৫০ পরিবারের ৬০০ জন মানুষের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়। বিতরণ শুরুর বেশ খানিক পর তালিকার নিরপেক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আমরা ঐ গ্রামের কিছু বাড়িতে সরেজমিনে পরিদর্শনে যাই।
পথে দেখি এক মাদ্রাসা ছাত্র। বয়স ১৫-১৬ র বেশি নয়। ইফতার নিয়ে যাচ্ছিল। প্রশ্ন করলাম, ইফতার পেয়ে খুশি হয়েছো? ছেলেটি একটা হাসি দিয়ে মাথা নাড়িয়ে জানাল, হ্যাঁ। মায়াবি ছেলেটির মুখে হাসি কিন্তু আড়ালে ছিল বেদনা। ছেলেটির সাথে ওর বাড়িতে গেলাম, জানলাম ছেলেটির বাবা নেই। মা বাড়ি বাড়ি কাজ করে ছেলেটিকে মাদ্রাসায় পড়ায়। এ রকম অনেক দরিদ্র পরিবার এই ইফতার পাচ্ছে দেখে ভালো লাগল।
1

এবার হাতিবান্ধা উপজেলার ভোটমারীতে আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য। গত কয়েক দিনের ঢাকার তাপমাত্রা ৩৭-৩৮ ডিগ্রী। কিন্তু লালমনিরহাটে গিয়ে দেখি ভিন্ন চিত্র। ভোটমারীতে রওনার মুহূর্তে বৈশাখের ঝড়ের কবলে পড়ে যাই।২ ঘণ্টা পিছিয়ে গেল যাত্রা।
বৃষ্টির ভাব দেখে মনে হল এ বৃষ্টি সহজে থামার নয়। কিন্তু আর তো দেরী করা যাচ্ছে না। দুর্যোগের বাধার কারণে তো ইফতারের প্যাকেট নিতে আসা লোকদের অপেক্ষা করিয়ে রাখা উচিত হবে না। তাই আমরা দু’জন দুটো রেইনকোট পরে নিলাম এবং রবিউল ভাইয়ের মোটর সাইকেল ধার নিয়ে আমরা দেড় ঘণ্টার জার্নির পর লালমনিরহাট সদরে পৌঁছলাম।

তাড়াহুড়ো করে হোটেলে উঠে কাপড় পরিবর্তন করে রিগান আশরাফকে সঙ্গে নিয়ে আবারো দীর্ঘ প্রতিকূল সড়ক পাড়ি দিয়ে ভোটমারীতে পোছাই। স্থানীয়দের সহযোগিতায় একে একে ৪০০ জনকে ইফতারের প্যাকেট প্রদান করা হয়। যদিও এখানে চাহিদার তুলনায় দরিদ্রদের সংখ্যা বেশি ছিল। যাইহোক, বিতরণ শেষে মাগরিবের পর রওনা করে আমরা রাত ১০ টার পর হোটেলে পোঁছলাম।

2

পরদিন সকালে তৃতীয় স্পট কালিগঞ্জ উপজেলার চন্দপুরে দীর্ঘ ৩০ কিঃমিঃ মোটর সাইকেল জার্নি করে পৌঁছলাম। স্থানীয় মুরুব্বিদের উপস্থিতি, মাদ্রাসা ছাত্রদের জটলা, কৌতূহলী গ্রামবাসী, সর্বোপরি যাদের জন্য এই আয়োজন, অর্থাৎ ইফতার গ্রহণকারীদের সমাগম, সব মিলিয়ে এক উৎসব মুখর পরিবেশ।
রিগান, রাশেদুল এর কথায় উঠে এসেছে গ্রামবাসীদের প্রতি নামাজ, রোজা পালনের পরামর্শ। বিতরণের কার্যক্রমের সাথে সাথে আমরা গ্রামের কিছু বাড়ি গিয়ে তাদের সাথে কুশল বিনিময়ের চেষ্টা করলাম। এরপর শুরু হয় মাদ্রাসার ছাত্রদের মাঝে পাঞ্জাবি-পাজামা বিতরন। ছাত্ররা নতুন পাঞ্জাবি পরিধান করে যখন উল্লাস করছিল, মনে হলো তারা যেনো পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে।
এরপর চতুর্থ স্পট ভেলাগুরির উদ্দেশে রওনা করলাম।

3

ভেলাগুরিতেও অনেক মানুষ আমাদের অপেক্ষায় ছিল। ভেলাগুরিতে যখন আমরা মানুষদের উদ্দেশ্য ইফতার নিয়ে কথা বলছিলাম, তখন দেখলাম অনেক মুরুব্বী আনন্দে কাঁদছিল। এরপর সেখানে এক মাদ্রাসায় কিছু ছাত্রের মাঝে তুলে দিই নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা।

4

শেষ স্পট বড়খাতা। আবারও দীর্ঘপথ প্রায় ৬০ কিমি মোটর সাইকেল করে পৌঁছলাম। অন্যান্য স্থানের মত এখানেও অনেক স্পর্শকাতর দৃশ্যের সাক্ষী হলাম। সবার চোখেমুখে ঈদের খুশি। অনেকে আনন্দে আত্মহারা যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না এত সুন্দর এক ইফতারের ঝুলি তার হাতে। অবশেষে ইফতার বিতরন কার্যক্রম শেষ হলো। ২ দিনের টানা পরিশ্রমের পর সুযোগ হলো একটুখানি বিশ্রামের।
5

এবার বাড়ি ফেরার পালা। রাত ১০ টার গাড়িতে আগে থেকেই টিকেট করা। এদিকে তিস্তা ব্যারেজের মাত্র ১০ কিঃমিঃ দূরে থেকে এর সৌন্দর্য উপভোগ না করে বাড়ি ফিরি কিভাবে? ভ্রমণটাতো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই গাড়ি মিস করার টেনশন মাথায় নিয়েই তিস্তা ব্যারেজের দিকে ছুটলাম। নদী তীরের শীতল হাওয়া, ছোট ছোট ঢেউ – এক কথায় অসাধারন।
এবার মোটর সাইকেলে ৫০ থেকে ৭০ এমনকি কখনো কখনো ৮০ কিঃমিঃ বেগে ছুটে হোটেলে পোঁছাই। সব গুছিয়ে বাসে করে প্রিয় ঢাকায় ফিরে আসি।

পুনশ্চঃ
এক ডাক্তার বড় ভাইয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ভাই আপনার এই কঠিন রুটিন লাইফে আপনি বোর হন না? জবাবে বলেছিলেন, আমরা দিন-রাত স্টাডি করে, কঠোর সাধনা করে, রোগ এবং রোগীদের নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ, গবেষণা করে যেমন ক্লান্ত হয়ে উঠি পরোক্ষণেই যখন চিকিৎসা সেবা নেয়া রোগীর মুখে হাসি দেখি এবং তাদের মূল্যবান দোয়া দোয়া আর কথা শুনি তখন পূর্বের ক্লান্তি এক নিমেষেই দূর হয়ে যায়।
ঠিক তেমনি এই আমরা তিনজন ৫ স্থানে ইফতার বিতরনের জন্য দীর্ঘপথ (কাঁদা, পানি, চর, মেঠো পথ) মোটর সাইকেল ড্রাইভ করে, কর্দমাক্ত রাস্তায় জুতা ডুবিয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে উত্তপ্ত হয়ে, ক্লান্ত শরীরে যখন দরিদ্র মানুষদের হাতে ইফতার তুলে দিলাম, তখন তাদের হাসিমাখা মুখগুলো দেখে আমাদের সব কষ্ট বিলিন হয়ে গিয়েছিল।

— মোঃ হুমায়ূন কবির (লিথু)

Total number of views: 104

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmailFacebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *