কিমচি – অণুগল্প

nDls

চৌধুরি সাহেবের মনটা খারাপ। আজ ফজরের সলাতটা জামাতে পড়া হয়নি। ঘুম যখন ভেঙেছে তখন ৫টা ৩৮ বাজে। খুব তাড়াহুড়া করে গেলেও ৫টা ৪৫ এর আগে মাসজিদে পৌঁছানো যাবে না।

স্ত্রীকে ডেকে তুললেন তিনি, স্ত্রীর সাথে জামাত পড়লেন। মাসজিদে জামাতে ২৫গুণ বেশি সাওয়াব হয়। ২৫ গুণ মানে ২৫ বার ফজরের সলাত পড়া! কত বড় একটা লস হয়ে গেল আজকে।
সলাত শেষ হতে হতে ৬টা বেজে গেছে। বাচ্চাদের স্কুল পর্ব শুরু হয় সকাল সাতটা থেকে। স্ত্রী করুণ চোখে বলল – আমি এক ঘন্টা ঘুমিয়ে নিই?

আহারে বেচারা! সারাদিন বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেওয়া, রান্না-বান্না, সংসারের দেখাশোনা – এসব ‘কিছুই করে না’ করতে করতে দিন চলে যায়। আর এখন পেট কাটার যুগ। ডাক্তাররা পেট কেটে বাচ্চা বের করে দেয় সহজেই কিন্তু মায়েদের সেই ধাক্কা সামলাতে বাকি জীবনটা চলে যায়।

স্ত্রী ঘুমুতে গেলেন। চৌধুরি সাহেব গেলেন রান্নাঘরে। স্ত্রীকে একটা সারপ্রাইজ দেবেন আজ।
ডায়নিং রুমের শেলফে স্টিক নুডলস ছিল। ৩০০ গ্রামের প্যাকেট ছিল দুটো। চৌধুরি সাহেব একটা নিলেন। ফ্রিজ থেকে বের করলেন দুটো ডিম। চওড়া মুখের একটা হাড়ি খুঁজে তাতে গরম পানি চড়িয়ে দিলেন। ঢাকনাটা গেল কই? এদিক ওদিক খুঁজে ডিপ ফ্রিজের ওপরে বড় ঢাকনাটা পেলেন। না ঢাকলে পানি ফুটতে সময় নেয় বেশি। এর মধ্যে মোবাইলে সূরা তুর ছেড়ে দিলেন। শুনতে শুনতে অনেক সহজেই কুরআন মুখস্থ হয়ে যায়।

রান্নাঘরে শেলফ থেকে কিমচির বোতলটা খুঁজে বের করলেন। তিন চামচ কিমচি একটি চালুনিতে নিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিলেন।

কী রান্না করা যায়? কিমচি র‍্যামেন সুপ? র‍্যামেন জিনিসটা নিয়ে চৌধুরি সাহেবের একটা ফ্যাসিনেশন আছে। অপরিপক্ককালে যখন তিনি নারুতো দেখতেন তখন থেকেই তার মনে হতো – র‍্যামেন জিনিসটা খেয়ে দেখতে হবে।

গুগল সার্চ দিলেন কিমচি রামেন দিয়ে। একটা রেসিপি এলো। পড়ে একটা ধারণা নিলেন তিনি। এবার কাজ শুরু করলেন।

একটা কড়াই চাপিয়ে গরম করতে দিলেন। পেঁয়াজ লাগবে, ডিপে প্রাক্তন টক দইয়ের বাটিতে কাটা পেয়াঁজ পেলেন। আরো দু-একটা দইয়ের ডিব্বা খুললেন। একটাতে চিংড়ি – নাহ, ছোট ভাইটা চিংড়ি খায় না। ছোট্ট একটা পুটুলিতে খানিকটা মুরগির বুকের মাংস পেলেন। – হ্যা, এটাই খুঁজছিলেন তিনি মনে মনে।

এই রে! কড়াই তেতে গেছে ভীষণ। লোহা পুড়ছি পুড়ছি টাইপের গন্ধ। তাড়াতাড়ি তাতে অল্প খানিকটা তেল ঢাললেন চৌধুরি সাহেব। সেখানে ফ্রোজেন পেঁয়াজ দিলেন। তারপর কিমচি ঢেলে দিলেন। নাড়লেন খানিকক্ষণ। দুটো ডিম ভেঙে দিলেন। হুম, লেগে যাচ্ছে তলায়। আরেকটু তেল দিয়ে তলাটা খুন্তি দিয়ে ঘসে দিলেন আচ্ছামতো।

পানিটা এদিকে গরম হয়ে এসেছে। হোক। ফুটুক ব্যাটা আগে।
ফ্রোজেন মুরগি পানিতে ভিজিয়ে দিলেন। তারপর ঠান্ডা ছাড়তে না ছাড়তে ছুরি দিয়ে ছোট ছোট টুকরো টুকরো করে কেটে ফেললেন। কিমচি আর ডিমকে একটু পাশে সরিয়ে আরেকটু তেল ঢাললেন মাঝে। সেখানে মুরগির কিউব সাইজের টুকরোগুলো ভাজতে দিলেন।

পানি ফোটার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। নুডলসের প্যাকেট থেকে স্টিকগুলো বের করে না ভেঙেই পানিতে ঢেলে দিলেন। সবটুকু ভেতরে যায়নি। একটু রোসো বাবা, মেরুদণ্ড ভাঙা লাগে না সবখানে। শিরদাঁড়া নরম হলে সবাই মাথা নোয়ায়। হক কথা। আধ মিনিট বাদে চামচের হালকা চাপে সবাই হাড়ির ভেতরে ফুটতে শুরু করল।
এদিকে কিমচি, মুরগি বেশ ভাজা হয়ে গেছে।

রান্নাঘরে বেশ কয়েকদিন পরে এলেন চৌধুরি সাহেব। বিভিন্ন বোতল ঘাটছেন। পুরোনো একটা তেতুলের সসের বোতল পেলেন, শেষের সামান্য সসটুকু ঢেলে দিলেন কড়াইয়ে। কিছুটা পানি ভরে ঝাঁকিয়ে ধুয়ে কড়াইয়ে ঢেলে দিলেন।

অপচয়ের ব্যাপারে চৌধুরি সাহেব আল্লাহর অসন্তুষ্টিকে খুব ভয় পান। কত পরিবার আল্লাহর নিয়ামতের অপচয় করে ধ্বংস হয়ে গেছে! অথচ আল্লাহ কৃতজ্ঞ মানুষদের নিয়ামত বাড়িয়ে দেন।
নুডলস চার-পাঁচ মিনিট সিদ্ধ হয়েছে। চালুনিতে দিয়ে গরম পানি ঝরিয়ে নিলেন তিনি। তারপর ঠান্ডা পানিতে একবার ধুয়ে কড়াইয়ে দিয়ে দিলেন। তিন কাপ পানি দিলেন সাথে।
এবার সয়া সস দিলেন দু চামচ। লবন এক চা চামচ। জানজাবিল মানে আদার গুড়ো আধ চামচ।

সরোবর থেকে বাসাল, মানে পেঁয়াজ আর সুম, অর্থাৎ রসুন গুঁড়ো কিনেছিলেন। জমে গেছে শক্ত হয়ে। পেঁয়াজ আর রসুন গুঁড়োর এই এক জ্বালা, বাতাসের আর্দ্রতাতেই জমে যায়। কাটা চামচ দিয়ে খুঁচিয়ে বের করে এক চামচ বাসাল আর আধ চামচ সুম ঢেলে দিলেন সুপের মধ্যে।

সুপ ফুটছে। সরোবরের ফুলফুল মানে গোলমরিচের গুড়ো নেই বাসায়। গোল মরিচ হামানদিস্তায় গুড়ো করলেন। এক চামচ গুড়ো চলে গেল সুপে। লবন দেখলেন – একটু লাগবে। অর্ধেক চামচ টেস্টিং সল্ট দিলেন সুপ-নুডলসে।

রান্না শেষ। একি! সুপটা কোথায় গেল? খালি তো নুডলস দেখা যাচ্ছে। হুম, নুডলসগুলো সব সুপ খেয়ে ফেলেছে। যাই হোক – আবার পানি দিয়ে সুপ বানানোর সময় নেই। এমনটাই চলুক।
কড়াই ধরেই নিয়ে আসলেন ডাইনিং টেবলে। সাতটা বাজে। দুটো বাটিতে বেড়ে দিলেন।

স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে আসলেন টেবলে। ‘আজ তোমার জন্য নাস্তা বানালাম।’ তুমি তো প্রত্যেক বেলায় বানাও। স্ত্রীর চেহারাতে একটা আনন্দের আভা ফুটে উঠল।

খেতে খেতে চৌধুরী সাহেব স্ত্রীর গ্লাসে পানি ঢেলে দিলেন–বিশাল কিছু নয়, সার্ভ করার টোকেন মাত্র। কিছু আবেগঘন কথা বললেন। নাটক সিনেমা হলে এসময় নায়িকার চোখ ছলছল করার কথা ছিল। কিন্তু এটা বাস্তব জীবন বিধায় চৌধুরী সাহেব দেখলেন তার স্ত্রী ‘আবেগে কাইন্দালাইছি’ এর বদলে হাসি হাসি মুখ করে কিমচি র‍্যামেন খেয়ে যাচ্ছে।

নাটক-সিনেমা-উপন্যাস তাকে সারাজীবন শিখিয়েছে মেয়েদের মন জয় করা যায় না। কিন্তু স্ত্রীকে এক গ্লাস পানি ঢেলে দিলে কিংবা মাকে একটা কাপ চা বানিয়ে খাওয়ালে তারা যে এত খুশি হয় তার ব্যাখ্যা কী?

ব্যাখ্যা বোধহয় রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই কথাটাঃ
বস্তুর প্রাচুর্যে ঐশ্বর্য নেই, অভাবহীনতা তো অন্তরে।
আসলেই! যে অল্পে তুষ্ট তাকে রুষ্ট করা কষ্ট।

চৌধুরী সাহেবের মনটা আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যাচ্ছে।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় যা-ই খরচ করো, তোমাকে তার সওয়াব অবশ্যই দেয়া হবে, এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও তার জন্যও। তিনি আরো বলেছেন, তোমাদের মধ্যে উত্তম ঐ ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।
মন ভালো হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো – ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ, আর আত্মসমর্পণেই যে শান্তি এটা যদি মহিলা অধ্যায়ওয়ালা মানুষেরা বুঝত!

[একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে]

Total number of views: 53

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmailFacebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedintumblrmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *